যাদের রক্তে আমাদের গৌরবগাঁথা
শহীদ মতিউল ইসলাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ১৪৮নং কক্ষের বাসিন্দা ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউল ইসলাম। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আত্মোৎসর্গকারী এ বীরযোদ্ধা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জহুরুল হক হল শাখার প্রচার সম্পাদক ছিলেন। সম্রাজ্যবাদবিরোধী বিশ্ব নির্মাণে বদ্ধপরিকর মতিউল ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিপক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে সামনের কাতারের সৈনিক ছিলেন। নাপাম বোমায় নিশ্চিহ্ন মাইলাই গ্রামের ৫০০ নারী- পুরুষ হত্যা, উত্তর ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারের স্বীকৃতিদান এবং সাম্রাজ্যবাদের নিপাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ডাকসু সহযোগে প্রতিবাদ মিছিল বের করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া মিছিলের লক্ষ্য ছিল মার্কিন তথ্যকেন্দ্র (ইউসিস) ভবন, মতিউল ছিলেন মিছিলের সামনের সারিতে। ভিয়েতনামের জনগণের বিরোচিত সংগ্রামে সংহতি প্রকাশের মিছিলে পুলিশ একপর্যায়ে গুলি চালায়। শহীদ হন মতিউল ইসলাম এবং মীর্জা কাদের। গুলি মতিউলের গলা ভেদ করে চলে যায়। প্রতিবাদে পরদিন ঢাকাসহ সারাদেশে পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করে । ঢাকা থেকে ইউসিস ভবন প্রত্যাহার করা হয়।
শহীদ মির্জা কাদেরুল ইসলাম
১৯৭৩ সালের ১লা জানুয়ারি । ইউসিস ভবনে যাচ্ছে ছাত্র-জনতা । যাচ্ছে বিচার চাইতে, কেন নাপামের মরণঘাতে নিশ্চিহ্ন মাইলাই গ্রাম, কেন দিনের পর দিন ভিয়েতনামের বীর জনতার উপর অভব্য আক্রমণ । সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের অবিনাশী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং ডাকসুর যৌথ মিছিল গগনবিদারী স্লোগানে প্রকম্পিত করছে ঢাকার রাজপথ । সে চিৎকারে ভীত, কম্পমান মার্কিন সাম্রাজ্য; টলে উঠছে দেশে দেশে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের অন্যায়, অবিচার, হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ । আর মার্কিনের দালালরা স্লোগানের চাবুকে হচ্ছে দিশেহারা ।
স্লোগানের নেতৃত্ব কাদেরের । যে কাদের শোষণহীন সমাজ নির্মাণের ব্রত নিয়ে ভর্তি হয়েছে ঢাকা কলেজে । কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন মনোনীত ধর্ম ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক। সাম্রাজ্যবাদের অহংকারকে মিথ্যায় পরিণত করতে, ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারকে বাংলার ছাত্র-জনতার অভিবাদন পৌঁছে দিতে কাদেরের কন্ঠ উচ্চকিত । আচমকা সাম্রাজ্যবাদের অনুগতদের হুঁঙ্কার, বিনা উস্কানিতে পুলিশের গুলি। কাদেরের কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ছাত্রহত্যায় শহীদ হলেন ১৬ বছরের এক দুরন্ত স্বপ্ন, মির্জা কাদেরুল ইসলাম।
শহীদ সঞ্জয় তলাপাত্র
১৯৯৮-এর আগস্টের আগেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে উঠে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন। ফলে সেই সময়ে প্রায় প্রতিদিন ক্যাম্পাসে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হত। ২০ আগস্ট। সেদিন সকালে বটতলী স্টেশনে মিছিলের কোন কর্মসূচি ছিল না। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার আগে শিবির কর্মীরা রড, লাঠি আর বাঁশ নিয়ে হামলা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। আহত হয় অনেক শিক্ষার্থী। ঘটনার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে বটতলী স্টেশনে বিশাল মিছিল বের হয় এবং ক্যাম্পাসে বড় মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেদিনের হামলার সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ ছিল স্টেশনে মৌলবাদী ঘাতকদের দ্বারা সঞ্জয়ের মারাত্মক আহত হওয়া।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সঞ্জয় খাতা আর তুলির ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সকালের শাটল ট্রেনে যেতে চেয়েছিল তার প্রিয় ক্যাম্পাসে। কিন্তু মৌলবাদী চক্রের নির্মম লাঠি আর রডের আঘাতে তাকে আর ক্যাম্পাসে পৌঁছতে দেয়া হয়নি। পৌঁছে দিয়েছিল হাসপাতালে। তারপর দীর্ঘ ৪৮ ঘন্টা ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ করে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ২২ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মস্তিষ্কের রক্ত ক্ষরণ জনিত কারনে সঞ্জয় চিরতরে চলে যায়। থেমে যায় একটি প্রাণবন্ত জীবন। সেদিন ২২ আগস্ট ১৯৯৮ ছিল তার ২৪ তম জন্মদিন।
শহীদ মঈন হোসেন রাজু
মঈন হোসেন রাজুর জন্ম বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে। তবে তাঁর পরিবার প্রথমে চট্টগ্রাম এবং পরে ঢাকায় বসবাস শুরু করে। ঢাকায় থাকার সময় তিনি স্কুলজীবনেই যুক্ত হন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে। ১৯৮৭ সালে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ছিলেন বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী। তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তিনি নব্বইয়ের স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। ক্যাম্পাসে তখনকার বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের জোট গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের বন্দুকযুদ্ধ চলাকালেই গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের মিছিল লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মঈন হোসেন রাজু মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শহীদি আত্মবলিদানকে স্মরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনের সড়ক মোড়ে তৈরি করা হয় ‘সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য’। তাঁর মৃত্যুর পর এ দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান তাঁকে নিয়ে ‘পুরানের পাখি’ নামের কবিতাটি লিখেছিলেন।
শহীদ মাজাহারুল হক আসলাম
শহীদ মাজাহারুল হক আসলাম ১৯৮৫ সালে এসএসসি পাশ করার পর তার পরিবার ঢাকার মিরপুরে বসবাস শুরু করে ও নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন। স্কুল জীবন থেকেই আসলাম ভালো কিছু করার জন্য উদগ্রীব থাকতেন । শহীদ মাজাহারুল হক আসলাম মিরপুরের মনিপুর এরাকার ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন । সেখানে খুব আন্তরিকতার সাথে সংগঠনের কাজে নিয়োজিত থাকতেন পাশাপাশি নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন।। কলেজ শেষে মনিপুর এলাকায় সংগঠনের কাজ শেষ করে প্রতিদিন রাতে বাসায় ফিরতেন।
থানা সংসদ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সংসদের কাজে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। প্রাত্যাহিক জীবনের প্রায় সবটুকু সময় সংগঠনের কাজে ব্যয় করতেন। তখন ১৯৮৬ সালের ৩০ মার্চ, এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ে পতিত স্বৈরাচার এরশাদের পোষা গুণ্ডাবাহিনীর একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অস্থিতিশীল ও অগণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। অব্যাহত হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ৩০ মার্চ বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ ঘোষণা করে ছাত্র ইউনিয়ন। বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে স্বৈরাচারের গুণ্ডাবাহিনী ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে গুলি চালায়। এতে আসলাম গুলিবিদ্ধ হন এবং কিছুক্ষণ পর মারা যান। ঘাতকেরা হয়তো জানে না যে, আসলামদের মেরে নিঃশেষ করা যায় না। আসলামরা বেঁচে থাকে মুক্তির মন্দির সোপান তলে ।
শহীদ জগতজ্যোতি দাস
১৯৪৯ সালে জগৎ জ্যোতি দাস হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জগৎ জ্যোতি স্কুলে থাকাকালীন আইয়ুব খান জান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। জগৎজ্যোতি ১৯৭১ সাল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়ানোর জন্য সিদ্ধান্ত নেন। যোগ দেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ইকো-১ ট্রেনিং ক্যাম্পে। তার নেতৃত্বে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত হয় গেরিলা দল, যার নাম দেওয়া হয় ফায়ারিং স্কোয়াড ‘দাস পার্টি’। দাস বাহিনীর গেরিলা অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানি শত্রু ঘাঁটি ধ্বংস শুরু করে। পরবর্তীতে পাহাড়পুর অপারেশন, বানিয়াচংয়ে কার্গো বিধ্বস্ত করা, বানিয়াচং থানা অপারেশনসহ বেশ ক’টি ছোট বড় অপারেশন দাস পার্টির যোদ্ধারা সফল ভাবে সম্পন্ন করে।
পাক ক্যাম্প থেকে ২০০ গজ দূরে রাজাকার/পাক সেনাদের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে দাস পার্টি। রণাঙ্গনে পরিস্হিতির ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে এক পর্যায়ে জ্যোতি তার দলকে ফিরে যাবার নির্দেশ দিয়ে একটি মাত্র এলএমজি নিয়ে নিজে একাই যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন।এরপর দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন মাত্র দুইজন, জ্যোতি ও ইলিয়াছ। হঠাৎ ইলিয়াছ পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হন। জ্যোতি পিছু না হটে তার মাথার লাল পাগড়ি খুলে শক্ত করে ইলিয়াসের বুকে এবং পিঠে বেঁধে দেন, যাতে তার রক্তক্ষরণ থেমে যায়।যুদ্ধের এক পর্যায়ে ম্যাগজিন লোড করে শত্রুর অবস্থান দেখতে মাথা উঁচু করাতে ১টি গুলি জগৎজ্যোতির চোখে বিদ্ধ করে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাজাকার সদস্যরা রাতে জ্যোতির লাশ খুঁজে পেয়ে পাকবাহিনীকে খবর দেয় এবং জ্যোতির মৃতদেহটি আজমিরীগঞ্জ গরুর হাটে জনসমক্ষে, একটি খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে পেরেক মেরে রাখে। এক সময় কুশিয়ারা নদীতে জ্যোতির দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর ২২ বছর বয়সে তিনি শহীদ হউন।
শহীদ তাজুল ইসলাম
বাংলা ১৩৫০ সালে চাঁদপুরের মতলবে জন্মগ্রহণ করেন। ৭ম শ্রেণীর ছাত্র থাকতেই যোগ দেন ছাত্র ইউনিয়নের পতাকাতলে । ১৯৬৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ১ম বিভাগে এইচ এস সি পাশ করে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ছাত্র সংগঠনের কাজে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছিলেন, অভিভাবকেরা তাকে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ফেরাতে বিয়ে করিয়ে দেন। বিয়ের রাতেই চাঁদপুর ছেড়ে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় সম্মেলনের কাজে অংশগ্রহণের জন্য। ১৯৭৩-৭৪ সালে নির্বাচিত হন। কেন্দ্রীয় সংসদের প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে মেহনতি শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির লক্ষ্যে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। নিছক বিপ্লব রোমন্থনের জন্য নয়, তিল তিল করে সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে আদমজীর শ্রমিক পল্লীতে কাটিয়েছেন ১০ বছর । তাজুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে স্বৈরাচারী এরশাদের বিপক্ষে শ্রমিকরা হয়ে ওঠে আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি । ছিলেন আদমজী ট্রেড ইউনিয়নের সহ-সভাপতি, পাটকল ট্রেড ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক সম্পাদক।
শ্রমিক আন্দোলনের সে স্বর্ণোজ্জ্বল সময়ে আদমজীসহ সমগ্র ঢাকা অঞ্চলের শ্রমিক বেল্টে তাজুল আবির্ভূত হন স্বৈরাচারী এরশাদশাহীর অন্যতম বিপদ হিসেবে। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) দাবি আদায়ে হরতাল আহবান করে। হরতাল সফল করতে সমস্ত প্রস্তুতি শেষে বাড়ি ফিরছিলেন বিপ্লবের এ মহানায়ক । পথিমধ্যে স্বৈরাচারের পেটোয়া গু-াবাহিনী তাজুলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাতের কালো আঁধার বিপ্লবের এ লালফুলকে চিরতরে কেঁড়ে নেয় । এ মহান বিপ্লবী তার উত্তরসূরীদের জন্য রেখে গেছেন ইতিহাস হবার আহ্বান।
শহীদ প্রোটন দাসগুপ্ত
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানী শহীদ প্রোটন দাশগুপ্ত ১৯৮৮ সালে মাধবপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৯১ সালে সিলেট সরকারি বাণিজ্যিক কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৯১-১৯৯২ সেশনে ঢাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হন। ছোট বেলা থেকে শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন লালন করার কারণে ঢাকায় ছাত্র ইউনিয়নের কাজের সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৯৬ সালে প্রোটন সংগঠনের জাতীয় পরিষদ সদস্য হন। প্রোটন ছাত্র ইউনিয়ন লাখাই উপজেলার আঞ্চলিক শাখার সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৯৬ সালে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে লাখাই উপজেলার দুর্নীতিবাজ লোকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। সেই সময়ে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা প্রোটন দুর্নীতিবাজ লোকদের কাছে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এর প্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালের ১৪ জুন হবিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা প্রোটনের উপর হামলা চালায়।
শহীদ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম টিটু
শহীদ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম টিটু ১৯৭৬ সালে কিশোরগঞ্জ শহরে আজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কাজের সাথে যুক্ত হন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ বন্দুকের নলের উপর ভর করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসে। এরশাদ সামরিক শাসনের আবরণে দলছুট নেতা-কর্মীদের নিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতায় বসে। এরশাদের বিরুদ্ধে সারাদেশব্যাপী ছাত্র-জনতা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নভেম্বর ‘ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি’ সফল করতে টিটো (সকল যানবাহন সরকার বন্ধ করে দিলে) সাইকেলে চড়ে ঢাকায় মহাসমাবেশে হাজির হন। তার পাশে ছিলেন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রিয়াজুল হক আয়াজ, ক্ষেতমজুর নেতা রমেন্দ্র বর্মনসহ অনেকেই। নূর হোসেন বুকে পিঠে স্লোগান লিখেন ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক স্বৈরাচার নিপাত যাক’ এরশাদের পুলিশ বাহিনী মিছিলের গুলিবর্ষণ করলে নূর হোসেন টিটোসহ অনেকেই নিহত হন। স্বাধীন দেশে ৩৬ বছর কেটে গেলেও আমরা টিটো হত্যার বিচার এখনো পাইনি।
শহিদ বিপ্রদাস রায়
বিপ্রদাশ স্বপ্ন দেখতেন সমাজ বদলের সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের । চেয়েছিলেন দুঃখী মা বোনের মুখে হাসি ফোটাতে । তাই খুলনা জেলা সিপিবি’র সাথে এসেছিলেন ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারী পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)র লাখো জনতার মহাসমাবেশ ।
তার স্বপ্নকে রুদ্ধ করতে বিস্ফোরিত হয় কাপুরুষ ঘাতকদের রেখে যাওয়া বোমা । মূহুর্তেই হিমাংশু, মজিদ, হাশেমের মোক্তারের রক্তে লাল হয়ে যায় পল্টনের মাটি । আহত হন আরো অনেকে । বিপ্রদাশও মারাত্মকভাবে আহত হন । বোমার স্প্লিন্টার তাঁর বাম ফুসফুসের ওপরের অংশে আঘাত হানে। তাকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এরপর রাতে স্থানান্তর করা হয় মহাখালির বক্ষব্যাধি হাসপাতালে । বিপ্রদাশ লিপ্ত হন মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ে । ডাক্তাররা দ্রুত তাঁর ফুসফুসে অস্ত্রোপচার করেন । কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেন তিনি। কিন্তু ২৯ জানুয়ারি থেকে আবার তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে । শেষ পর্যন্ত ২ ফেব্রুয়ারি তিনি হার মানেন মৃত্যুর কাছে । ২০ বছরের টগবগে তরুণ বিপ্রদাশ ছিলেন খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা, পড়তেন অর্থনীতির ১ম বর্ষে।
১৯৯৯ সালে বাজুয়া এস এন কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর ভর্তি হন বিএল কলেজের অর্থনীতি বিভাগে । যেকোন আন্দোলন সংগ্রামে বিপ্রদাশ থাকতেন মিছিলের পুরোভাগে। হাসপাতালে আহত বিপ্রদাশ বলেছিলেন ‘আমি আবারো রাজপথে আসব, আমি মিছিলে আসব, আবার আসব।’ বিপ্রদাশের আর মিছিলে আসা হয়নি। কিন্তু বিপ্রদাশ জানেন ‘এক বিপ্র লোকান্তরে লক্ষ বিপ্র মিছিল করে।